শিশুর স্ক্রিন টাইম কমানোর জন্য শুধু “মোবাইল দেখবে না” বললে দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান হয় না। কখন দেখবে, কী দেখবে এবং স্ক্রিন বন্ধ করার পর কী করবে—এসব নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনায় বড়দের নিজের ফোন ব্যবহারের নিয়মও থাকতে হবে।
বয়স অনুযায়ী শিশুর স্ক্রিন টাইম কত হওয়া উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নির্দেশিকায় বসে থেকে ভিডিও দেখা বা গেম খেলার মতো স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য বয়সভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
| শিশুর বয়স | WHO-এর পরামর্শ |
|---|---|
| এক বছরের কম | স্ক্রিন টাইম সুপারিশ করা হয় না |
| এক বছর | বসে থেকে স্ক্রিন দেখা সুপারিশ করা হয় না |
| দুই বছর | দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা; কম হলে ভালো |
| তিন থেকে চার বছর | দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা; কম হলে ভালো |
এই নির্দেশনা পাঁচ বছরের কম বয়সীদের জন্য। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে একই সীমা সরাসরি প্রয়োগ না করে বয়স, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং ঘুম, পড়াশোনা ও খেলাধুলার সুযোগ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন জনস্বরের দিনে কত ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম স্বাভাবিক? শিশু ও বড়দের জন্য যা জানা জরুরি লেখাটি।
WHO স্ক্রিনে বসে থাকার সময়ের বদলে সক্রিয় খেলা এবং অভিভাবকের সঙ্গে গল্প, বই পড়া ও অন্যান্য স্ক্রিনবিহীন কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের গবেষণা কী বলছে?
বাংলাদেশের একটি জেলা শহরের preschool বয়সী শিশুদের নিয়ে ২০২৩ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মাত্র ৩১ শতাংশ বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইমের নির্দেশনা মেনেছে। শারীরিক কার্যকলাপ, স্ক্রিন টাইম ও ঘুম—তিনটি নির্দেশনাই মেনেছে ১৫ শতাংশ।
ঢাকার তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে আরেকটি গবেষণায় ৪০০ মায়ের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেখানে শিশুর দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে সমস্যাজনক স্মার্টফোন ব্যবহারের বেশি সম্ভাবনার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এসব নির্দিষ্ট নমুনার গবেষণা; পুরো বাংলাদেশের সব শিশুর পরিস্থিতি তুলে ধরে না। গবেষণাগুলো সম্পর্ক দেখিয়েছে, স্ক্রিন ব্যবহারই সমস্যার নিশ্চিত কারণ—এমন প্রমাণ দেয়নি।
শিশুর স্ক্রিন টাইম কমানোর ৭টি বাস্তব উপায়
১. আগে বুঝুন, কখন এবং কেন স্ক্রিন দেওয়া হচ্ছে
পরিবর্তন আনার আগে কয়েক দিন খেয়াল করুন: শিশুকে কোন সময়ে ফোন দেওয়া হচ্ছে? খাওয়ানোর জন্য, বড়দের কাজের সময়, নাকি শিশুর একঘেয়েমি কাটাতে?
একটি ছোট নোট রাখতে পারেন—কখন দেখেছে, আনুমানিক কতক্ষণ দেখেছে এবং কী দেখেছে। পড়াশোনার কাজ, পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল এবং বিনোদনের ভিডিও আলাদা করে লিখলে ব্যবহারের ধরন বোঝা সহজ হবে।
এটি পরিবারের অভ্যাস বোঝার একটি ব্যবহারিক উপায়। যেমন, প্রতিদিন রান্নার সময় ফোন দেওয়া হলে সেই সময়ের জন্য বিকল্প খেলার আয়োজন করা যেতে পারে।
২. শিশুকে নিয়ে সহজ পারিবারিক নিয়ম তৈরি করুন
American Academy of Pediatrics বা AAP পরিবারের জন্য একটি media plan তৈরির পরামর্শ দেয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী তাকে আলোচনায় রাখুন এবং এমন নিয়ম বেছে নিন, যা পরিবারের পক্ষে নিয়মিত মানা সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে ঠিক করতে পারেন:
খাবার টেবিলে ফোন থাকবে না।
ভিডিও দেখার নির্দিষ্ট সময় থাকবে।
সময় শেষ হলে ফোন নির্ধারিত জায়গায় রাখা হবে।
ঘুমের প্রস্তুতির সময় স্ক্রিন বন্ধ থাকবে।
একদিন অনুমতি দিয়ে পরদিন একই কারণে বকাঝকা করলে নিয়ম বোঝা কঠিন হয়। শিশুর দেখভাল করেন এমন অন্য বড়দের সঙ্গেও নিয়মগুলো মিলিয়ে নিন।
৩. খাবার ও ঘুমের প্রস্তুতির সময় স্ক্রিন সরিয়ে রাখুন
AAP খাবার ও ঘুমের সময়কে স্ক্রিনমুক্ত রাখার পরামর্শ দেয়। লক্ষ্য হলো, এই প্রয়োজনীয় কাজগুলোতে ফোনের হস্তক্ষেপ কমানো।
খাওয়ার সময় পরিবার একসঙ্গে কথা বলতে পারে। ঘুমের প্রস্তুতিতে গল্প পড়া, পরদিনের ছোট পরিকল্পনা করা বা শান্ত কোনো কার্যক্রম রাখা যায়।
এই নিয়ম বড়দেরও মানতে হবে। শিশুকে ফোন রাখতে বলে নিজে খাবার টেবিলে ভিডিও দেখতে থাকলে নিয়মের অর্থ তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
৪. ফোন বন্ধ করার আগে বিকল্প কাজ প্রস্তুত রাখুন
স্ক্রিন সরিয়ে নেওয়ার পর শিশুর সামনে শুধু খালি সময় রেখে দিলে আবার ফোন চাইতে পারে। তাই তার বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী কয়েকটি সহজ বিকল্প রাখুন:
ছবি আঁকা বা রং করা
ব্লক, পাজল বা বয়সোপযোগী খেলনা
গল্পের বই দেখা বা পড়ে শোনানো
পরিবারের সঙ্গে গান বা ছোট খেলা
নিরাপদ জায়গায় হাঁটা ও সক্রিয় খেলা
প্রতিবার নতুন খেলনা কেনার প্রয়োজন নেই। ঘরের নিরাপদ উপকরণ দিয়েও বয়সোপযোগী খেলা তৈরি করা যায়। WHO ছোট শিশুদের জন্য সক্রিয় খেলা এবং বড়দের সঙ্গে গল্প, গান ও পাজলের মতো কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়েছে।
৫. সময় শেষ হওয়ার নিয়ম আগে জানিয়ে দিন
ভিডিওর মাঝখানে হঠাৎ ফোন নিয়ে নেওয়ার বদলে শুরুতেই শেষ হওয়ার সময় বোঝান। ছোট শিশুর জন্য সহজ ভাষা ব্যবহার করুন: “টাইমার বাজলে ভিডিও বন্ধ হবে, তারপর আমরা ছবি আঁকব।”
AAP ছোট শিশুদের জন্য নিয়মিত রুটিন ও সময়সীমা রাখার পাশাপাশি built-in timer ব্যবহারের পরামর্শ দেয়, যাতে স্ক্রিন থেকে অন্য কাজে যাওয়ার পরিবর্তনটি সহজ হয়।
সময় শেষ হলে শিশুর বিরক্তি বা মন খারাপ হতে পারে। শান্তভাবে তা স্বীকার করে ঠিক করা নিয়ম মনে করিয়ে দিন। যেমন: “তোমার আরও দেখতে ইচ্ছা করছে বুঝতে পারছি। আজকের সময় শেষ, এখন আমরা অন্য কাজ করব।” এটি কথোপকথনের একটি উদাহরণ; প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
৬. Autoplay বন্ধ করুন এবং কনটেন্ট বেছে দিন
একটি ভিডিও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি শুরু হলে কোথায় থামতে হবে তা বোঝা কঠিন হতে পারে। AAP পরিবারের media plan-এ autoplay ও অপ্রয়োজনীয় notifications বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছে।
শিশুকে ফোন দেওয়ার আগে দেখুন:
কনটেন্টটি বয়সোপযোগী কি না
বিজ্ঞাপন বা অনুপযুক্ত দৃশ্য আছে কি না
একের পর এক ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছে কি না
প্রয়োজনীয় parental controls চালু আছে কি না
শুধু “শিক্ষামূলক” লেখা আছে বলে কোনো অ্যাপ বা ভিডিও নির্দ্বিধায় বেছে নেবেন না। সম্ভব হলে নিজে আগে দেখুন এবং শিশুর সঙ্গে সেটি নিয়ে কথা বলুন।
৭. নিজের ফোন ব্যবহারে একই নিয়ম দেখান
শিশু পরিবারের বড়দের ব্যবহারও দেখে। AAP তাই media plan-এ অভিভাবকের নিজের অভ্যাস অন্তর্ভুক্ত করতে বলে।
সন্তানের সঙ্গে খেলতে বা কথা বলতে বসলে ফোন কিছু সময় দূরে রাখতে পারেন। জরুরি কাজের জন্য ফোন ব্যবহার করতে হলে সংক্ষেপে বোঝান: “অফিসের একটি কাজ শেষ করছি, তারপর তোমার সঙ্গে বসব।”
পরিবারে ফোন ছাড়া সময় কাটানোর নিয়ম তৈরি হলে সেটি শিশুর একার দায়িত্ব হয়ে থাকে না।
কখন পেশাদারের পরামর্শ নেবেন?
স্ক্রিন বন্ধ করলে একবার কান্না করলেই শিশুকে “আসক্ত” বলা ঠিক নয়। তবে ব্যবহার নিয়মিতভাবে ঘুম, খাবার, খেলাধুলা, পড়াশোনা বা সম্পর্কের সময় ব্যাহত করলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন।
AAP সমস্যাজনক media use-এর সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে অন্য কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া, ব্যবহার নিয়ে নিয়মিত বিরোধ এবং প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাধার কথা উল্লেখ করেছে।
এসব সমস্যা চলতে থাকলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা উপযুক্ত শিশু মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে আলোচনা করুন। শিশুর বয়স, দৈনন্দিন রুটিন ও ব্যবহার সম্পর্কে নোট থাকলে পরিস্থিতি বোঝাতে সুবিধা হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
শিক্ষামূলক ভিডিও হলে কি যতক্ষণ খুশি দেখা যায়?
না। কনটেন্টের মান গুরুত্বপূর্ণ, তবে স্ক্রিনের জন্য ঘুম, খেলা বা সরাসরি যোগাযোগের সময় বাদ যাচ্ছে কি না সেটিও দেখতে হবে। AAP ভালো কনটেন্ট বাছাইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য সময় রাখার পরামর্শ দেয়।
সব বয়সের শিশুর জন্য কি দিনে এক ঘণ্টার সীমা?
না। এখানে উল্লেখ করা WHO-এর এক ঘণ্টার সীমা দুই থেকে চার বছর বয়সীদের বসে থেকে স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য। এটিকে সব বয়সের শিশুদের একক সীমা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
স্ক্রিন কমানোর সবচেয়ে সহজ শুরু কোনটি?
পরিবারের জন্য মানা সম্ভব এমন একটি নিয়ম দিয়ে শুরু করতে পারেন—যেমন খাবার টেবিলে সবাই ফোন সরিয়ে রাখা। সঙ্গে শিশুর জন্য বিকল্প কাজ ঠিক করুন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলান।
শিশুর স্ক্রিন টাইম কমানোর লক্ষ্য হলো ঘুম, খেলা, শেখা ও পরিবারের সঙ্গে সময়ের জায়গা রক্ষা করা। স্পষ্ট নিয়ম, উপযুক্ত কনটেন্ট এবং বড়দের অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে রেখে এগোন।