ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় করার সুযোগ আছে। সেই সুযোগের সঙ্গে দক্ষতা, প্রতিযোগিতা, কাজ খোঁজার সময়, খরচ এবং অনিশ্চয়তাও জড়িত। তাই কোনো কোর্সের বিজ্ঞাপনে বড় অঙ্কের আয়ের প্রতিশ্রুতি দেখলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: এই দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ কী?
ফ্রিল্যান্সিং আসলে কী?
ফ্রিল্যান্সিং হলো স্বাধীনভাবে গ্রাহকের জন্য কাজ বা সেবা দেওয়ার একটি পদ্ধতি। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজাইন, অনুবাদ, লেখালেখি বা অন্য কোনো দক্ষতা দিয়ে কেউ এভাবে কাজ করতে পারেন।
এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: কোনো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে শেখা এবং গ্রাহকের প্রয়োজনমতো কাজ করতে পারা আলাদা দক্ষতা। অ্যাকাউন্ট খোলা, প্রোফাইল সাজানো বা প্রস্তাব পাঠানোর নিয়ম জানা কাজে লাগে। কিন্তু গ্রাহককে যে সেবা দেওয়া হবে, সেটির মানও গুরুত্বপূর্ণ।
“ফ্রিল্যান্সিং শেখা” কথাটির আড়ালে তাই কী শেখানো হচ্ছে, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, অনুশীলন, প্রকল্পে প্রতিক্রিয়া এবং গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ—এসবের জায়গায় শুধু আয়ের গল্প থাকলে প্রশ্ন করার যথেষ্ট কারণ আছে।
বাংলাদেশে আয়ের প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ কি পাওয়া গেছে?
পাওয়া গেছে। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগের সঙ্গে পুরো প্রশিক্ষণ খাতকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি প্রতিবেদনে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বিজ্ঞপ্তি উদ্ধৃত করে জানানো হয়, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয়ের কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আপস্পট অ্যাকাডেমি নামের একটি ফেসবুক পেজে ঘরে বসে দিনে ১০ থেকে ৪০ ডলার আয়ের বিজ্ঞাপন এবং ভুয়া রিভিউ প্রচার করা হতো। বিনা মূল্যের কোর্সের কথা বলে আগ্রহীদের যুক্ত করার পর কথিত প্রিমিয়াম সফটওয়্যারের জন্য আড়াই হাজার টাকা চাওয়া হতো। টাকা নিয়েও প্রতিশ্রুত টুলস সরবরাহ না করার অভিযোগ ছিল।
এই ঘটনাটি আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রশিক্ষণ বিক্রির ঝুঁকির একটি নথিভুক্ত উদাহরণ। তবে প্রতিবেদনে বর্ণিত বিষয়গুলো পুলিশের অভিযোগ; গ্রেপ্তার হওয়া আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। এই সূত্রে মামলার চূড়ান্ত ফলাফলও জানা যায় না।
একইভাবে, এ ঘটনা থেকে “বাংলাদেশের বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে”—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। সেই দাবি প্রমাণ করতে বিস্তৃত ও প্রতিনিধিত্বশীল তথ্য প্রয়োজন।
প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলেই কি কাজ পাওয়া যায়?
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, কাজের সুযোগ থাকা আর প্রত্যেক কর্মীর পর্যাপ্ত কাজ পাওয়া এক বিষয় নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২০২১ সালের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, জরিপে অনলাইন ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের ৮৬ শতাংশ কর্মী আরও কাজ করতে চেয়েছেন। কিন্তু কাজের স্বল্পতা ও শ্রমের অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে তাঁরা অতিরিক্ত কাজ পাচ্ছিলেন না।
এর অর্থ এই নয় যে ৮৬ শতাংশ কর্মী কোনো আয় করেননি। বরং তাঁরা যতটা কাজ করতে চেয়েছেন, ততটা কাজ পাননি। তথ্যটি আন্তর্জাতিক গবেষণার; বাংলাদেশের নতুন ফ্রিল্যান্সার বা কোনো নির্দিষ্ট কোর্সের শিক্ষার্থীদের সাফল্যের হার হিসেবে এটি ব্যবহার করা যাবে না।
তবু গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বাজারে পর্যাপ্ত কাজ পাওয়া যখন প্রতিষ্ঠিত কর্মীদের জন্যও সমস্যা হতে পারে, তখন নতুন শিক্ষার্থীর আয় নিশ্চিত করার দাবি কীভাবে করা হচ্ছে?
নিবন্ধিত প্রোফাইলের সংখ্যা আর উপার্জনকারীর সংখ্যা এক নয়
২০২১ সালে প্রকাশিত Otto Kässi, Vili Lehdonvirta ও Fabian Stephany-এর গবেষণায় বিশ্বজুড়ে অনলাইন শ্রমবাজারে প্রায় ১৬ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার প্রোফাইলের অনুমান দেওয়া হয়। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ অন্তত একবার কাজ পেয়েছিল; প্রায় ৫০ লাখ অন্তত ১০টি প্রকল্প শেষ করেছিল অথবা অন্তত ১ হাজার ডলার আয় করেছিল।
সংখ্যাগুলো পড়ার সময় সতর্কতা দরকার। একজনের একাধিক প্রোফাইল থাকতে পারে। এটি বর্তমান বাংলাদেশের হিসাব নয়, আর কোনো প্রশিক্ষণ কোর্সের সাফল্য বা ব্যর্থতার হারও নয়।
গবেষণাটি থেকে যে বিষয়টি বোঝা যায়, তা হলো: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করা, কাজ পাওয়া এবং ধারাবাহিকভাবে আয় করা—তিনটি আলাদা অবস্থা। বিজ্ঞাপনে বড় সংখ্যার উল্লেখ থাকলে সেটি কোন অবস্থার হিসাব, তা জানতে হবে।
“লাখ টাকা আয়” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
কোনো সফল ফ্রিল্যান্সারের বড় অঙ্কের আয় সত্য হতে পারে। কিন্তু সেই উদাহরণ দেখে একজন নতুন শিক্ষার্থীর সম্ভাব্য আয় বুঝতে হলে আরও তথ্য প্রয়োজন।
অঙ্কটি কি এক মাসের, নাকি কয়েক বছরের মোট আয়? একজনের, নাকি একটি দলের? প্ল্যাটফর্মের ফি কাটার আগে, নাকি পরে? একই ব্যক্তি অন্য মাসগুলোতেও কি কাছাকাছি আয় করেছেন?
প্ল্যাটফর্মের খরচও হিসাব বদলে দেয়। Fiverr-এর আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুযায়ী, সম্পন্ন অর্ডারের ক্রয়মূল্যের ৮০ শতাংশ ফ্রিল্যান্সারের আয় হিসেবে যোগ হয়। অর্থাৎ, ১০০ ডলারের অর্ডারে এই ধাপে আয় হয় ৮০ ডলার।
Upwork-এর বর্তমান নির্দেশনায় প্রতি চুক্তিতে ফ্রিল্যান্সারের সার্ভিস ফি ০ থেকে ১৫ শতাংশ বলা হয়েছে। তাই সেখানে সব চুক্তির জন্য একই ফি ধরে হিসাব করা ঠিক হবে না।
এর পাশাপাশি নিজের কাজে ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, সফটওয়্যার বা সরঞ্জামের খরচ থাকতে পারে। টাকা তোলার ব্যবস্থাতেও প্রযোজ্য খরচ যাচাই করতে হবে।
ফলে বিজ্ঞাপনের বড় অঙ্কটির পাশে আরেকটি প্রশ্ন জরুরি: সব খরচের পর হাতে কত থাকে?
কাজ খোঁজার সময়ও হিসাবের অংশ
ফ্রিল্যান্সারের সময় শুধু গ্রাহকের কাজ সম্পন্ন করতেই যায় না। সম্ভাব্য কাজ খোঁজা, প্রস্তাব লেখা, আলোচনা, পোর্টফোলিও তৈরি এবং নতুন দক্ষতা শেখার সময়ও আছে।
একটি কাল্পনিক উদাহরণ ধরা যাক। কেউ একটি প্রকল্পে ১০ হাজার টাকা পেলেন এবং সেটি করতে ২০ ঘণ্টা লাগল। শুধু এই সময় ধরলে ঘণ্টাপ্রতি আয় ৫০০ টাকা।
কিন্তু কাজটি পাওয়ার আগে প্রস্তাব পাঠানো ও আলোচনায় আরও ১০ ঘণ্টা গেলে মোট সময় দাঁড়ায় ৩০ ঘণ্টা। তখন খরচ কাটার আগেই ঘণ্টাপ্রতি আয় প্রায় ৩৩৩ টাকা।
এটি কোনো জরিপের ফল নয়; হিসাব বোঝানোর উদাহরণ। একই আয়ের অঙ্কের পেছনে কত সময় যাচ্ছে, সেটিও বাস্তবতা মূল্যায়নের অংশ।
সফল শিক্ষার্থীর গল্প কি কোর্সের কার্যকারিতা প্রমাণ করে?
একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য তাঁর অভিজ্ঞতার প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু পুরো কোর্সের ফলাফল জানতে মোট শিক্ষার্থীর তথ্য প্রয়োজন।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান কয়েকজন সফল শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে। তখন জানতে হবে:
সংশ্লিষ্ট ব্যাচগুলোতে মোট কতজন ভর্তি হয়েছিলেন?
কতজন কোর্স শেষ করেছেন?
কতজন প্রথম পারিশ্রমিক পেয়েছেন?
কতজন নিয়মিত আয় করছেন?
ফলাফল কোন সময় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে?
দেখানো আয় কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে?
কেউ আগে থেকেই দক্ষ ছিলেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজনের ফলাফল এবং সম্পূর্ণ নতুন একজনের ফলাফল একইভাবে উপস্থাপন করলে পাঠক ভুল ধারণা পেতে পারেন।
সাফল্যের গল্পের সঙ্গে মোট শিক্ষার্থীর হিসাব থাকলে দাবিটি বিচার করা সহজ হয়। কয়েকটি স্ক্রিনশট দিয়ে সবার সম্ভাব্য ফলাফল বোঝানো যায় না।
কোর্স কেনার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
একটি প্রশিক্ষণ দক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তার মূল্য বুঝতে আয়ের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি শেখানোর পদ্ধতি দেখতে হবে।
পাঠ্যক্রম: নির্দিষ্ট কী কাজ শেখানো হবে? কোর্স শেষে কী ধরনের কাজ নিজে করতে পারবেন?
অনুশীলন ও প্রতিক্রিয়া: নিজের প্রকল্প করার সুযোগ আছে কি? ভুল ধরিয়ে সংশোধনের ব্যবস্থা কী?
প্রশিক্ষকের অভিজ্ঞতা: সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাচাইযোগ্য কাজের উদাহরণ আছে কি?
সম্পূর্ণ খরচ: ভর্তি ফি ছাড়াও সফটওয়্যার, পরীক্ষা, সার্টিফিকেট বা অন্য কোনো খরচ আছে কি?
সহায়তার শর্ত: কোর্স শেষে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, কত দিন এবং কীভাবে?
আয়ের দাবির প্রমাণ: ফলাফলের তথ্য শুধু সফল কয়েকজনকে নিয়ে, নাকি পুরো ব্যাচকে নিয়ে?
লিখিত নীতি: বিজ্ঞাপনে টাকা ফেরত বা আয় নিশ্চিত করার কথা থাকলে তার সুনির্দিষ্ট শর্ত কী?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া একটি কোর্স মূল্যায়নের ভালো শুরু। “গোপন পদ্ধতি” বা “বিশেষ সফটওয়্যার” শুনে টাকা দেওয়ার আগে বুঝুন, সেটি দিয়ে গ্রাহকের কোন প্রয়োজন মেটানো হবে।
নতুনদের জন্য বাস্তবসম্মত শুরু
শুরুতে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা বেছে নিয়ে তার মান যাচাই করা বেশি কার্যকর। ছোট প্রকল্প তৈরি করুন, কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন কারও প্রতিক্রিয়া নিন এবং নিজের কাজের নমুনা গড়ে তুলুন।
এরপর সম্ভাব্য গ্রাহকের প্রয়োজন বোঝা, কাজের পরিধি নির্ধারণ, সময়ের হিসাব এবং যোগাযোগের অনুশীলন করুন। বড় অঙ্কের কোর্স কেনার আগে নমুনা ক্লাস ও পাঠ্যক্রম দেখে নিজের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
একটি কোর্স শেষ করার সময় নির্দিষ্ট হতে পারে। কিন্তু প্রথম কাজ পাওয়া বা নিয়মিত আয়ে পৌঁছানোর সময় সবার জন্য এক ধরে নেওয়া যায় না। তাই প্রত্যাশিত আয় দিয়ে আগাম খরচের পরিকল্পনা করার আগে সেই প্রত্যাশার ভিত্তি যাচাই করুন।
শেষ কথা
ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগ মূল্যায়ন করতে সফল মানুষের গল্প দরকার। একই সঙ্গে প্রয়োজন কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা, ব্যয়, সময় এবং প্রশিক্ষণের ফলাফলের পূর্ণ হিসাব।
বাংলাদেশে প্রশিক্ষণের নামে আয়ের প্রলোভন দেখানোর নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও পর্যাপ্ত কাজ পাওয়ার সমস্যা উঠে এসেছে। কিন্তু এসব তথ্য দিয়ে দেশের সব বা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
“লাখ টাকা আয়” লেখা দেখলে তাই শুধু অঙ্কটির দিকে তাকাবেন না। জিজ্ঞেস করুন—কার আয়, কত সময়ের আয়, কত খরচের পরের আয়, এবং মোট কতজনের মধ্যে এমন ফল হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বিজ্ঞাপনের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দূরত্ব বুঝতে সাহায্য করবে।
সূত্র
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ফ্রিল্যান্সিং শেখানোর নামে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ৬—২৪ জানুয়ারি ২০২৪
ILO: World Employment and Social Outlook 2021—ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্ম বিষয়ে গবেষণার সারসংক্ষেপ
তথ্য যাচাই: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। প্ল্যাটফর্মের ফি ও নীতি পরিবর্তিত হতে পারে। এই লেখায় নতুন সাক্ষাৎকার বা বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ ব্যবহার করা হয়নি।