প্রশ্ন হলো, ফোন ব্যবহারের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ আছে কি না। এর কারণে ঘুম, কাজ, পড়াশোনা বা কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়মিত ব্যাহত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারের চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ICT Access and Use Survey 2025–26-এর প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে দেশের ৯৮.৯ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি মোবাইল ফোন এবং ৭২.৪ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন ছিল। পাঁচ বছর বা বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন

অন্যদিকে DataReportal-এর Digital 2026: Bangladesh প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশে ১৮ কোটি ৬০ লাখ সক্রিয় মোবাইল সংযোগ এবং প্রায় ৮ কোটি ২৮ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হিসাব দেওয়া হয়েছে। মোবাইল সংযোগের সংখ্যা মানুষের সংখ্যা নয়—একজনের একাধিক সিম থাকতে পারে। আর BBS-এর জরিপ ও DataReportal-এর অনুমান ভিন্ন পদ্ধতিতে তৈরি, তাই তাদের হার সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না।

এই তথ্যগুলো বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার বিস্তার বোঝায়। তবে মানুষ দিনে কত ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছে, তার উত্তর এসব সংখ্যা দেয় না।

‘মোবাইল আসক্তি’ কি স্বীকৃত রোগ?

‘মোবাইল আসক্তি’ কথাটি দৈনন্দিন আলোচনায় প্রচলিত। কিন্তু সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারের জন্য ‘স্মার্টফোন আসক্তি’ নামে আলাদা কোনো রোগনির্ণয়কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ICD-11 স্বীকৃতি দেয়নি। গেমিং ডিসঅর্ডার আলাদা বিষয়; নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকলে এটি ICD-11-এ স্বীকৃত রোগনির্ণয়।

তাতে ফোন ব্যবহার নিয়ে সমস্যা হতে পারে না, এমন নয়। কেউ যদি বারবার ব্যবহার কমাতে চেয়েও না পারেন এবং তার ফলে ঘুম, কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা হয়, তাহলে সেটিকে সমস্যাজনক ব্যবহার হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত। কেবল বেশি সময় ফোন ব্যবহার করাই রোগের প্রমাণ নয়।

শিশুদের জন্য দিনে কতক্ষণ স্ক্রিন টাইম?

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য WHO বয়সভিত্তিক নির্দেশিকা দিয়েছে। নির্দেশিকাটি মূলত বসে থেকে স্ক্রিন দেখা, যেমন ভিডিও দেখা বা গেম খেলার সময় নিয়ে:

বয়স WHO-এর পরামর্শ
এক বছরের কম স্ক্রিন টাইমের পরামর্শ দেওয়া হয় না
এক বছর বসে থেকে স্ক্রিন দেখার পরামর্শ দেওয়া হয় না
দুই বছর দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা; কম হলে ভালো
তিন থেকে চার বছর দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা; কম হলে ভালো

শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের পাশাপাশি খেলাধুলা, ঘুম এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোও গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তারিত রয়েছে WHO-এর শিশুদের শারীরিক কার্যকলাপ, ঘুম ও স্ক্রিন ব্যবহারের নির্দেশিকায়।

বড়দের জন্য ‘স্বাভাবিক’ স্ক্রিন টাইম কত ঘণ্টা?

প্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য WHO নির্ধারিত দৈনিক স্ক্রিন টাইমের কোনো একক ঘণ্টার সীমা নেই। কারও কাজই কম্পিউটারে, কেউ ফোনে পড়াশোনা করেন, আবার কেউ অনলাইনে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এসব ব্যবহারকে উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিংয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না।

নিজের ব্যবহার মূল্যায়ন করতে এই প্রশ্নগুলো বেশি কাজে দেবে:

  • প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার পরও কি অভ্যাসবশত দীর্ঘ সময় স্ক্রল করেন?
  • ফোনের কারণে কি নিয়মিত ঘুমাতে দেরি হয়?
  • কাজ বা পড়াশোনায় মন দিতে গিয়ে কি বারবার ফোন দেখার তাগিদ আসে?
  • পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ও কি ফোন সরিয়ে রাখতে অসুবিধা হয়?
  • ব্যবহার কমাতে চেয়েও কি বারবার আগের অভ্যাসে ফিরে যান?

এক-দুদিন এমন হওয়া আর নিয়মিত জীবনে প্রভাব পড়া এক বিষয় নয়। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বললেই আসক্তি হয়েছে—এভাবে নিজেকে রোগনির্ণয় করবেন না।

অতিরিক্ত বা অসুবিধাজনক ব্যবহার কী প্রভাব ফেলতে পারে?

রাতে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যেতে পারে। উজ্জ্বল আলো, দেখা কনটেন্ট এবং ফোনে ব্যস্ত থাকার কারণে ঘুমে প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে অস্বস্তি বা ক্লান্তিও হতে পারে।

তবে স্ক্রিন টাইমের সব প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কী দেখছেন, কখন দেখছেন এবং তার জন্য ঘুম বা অন্য প্রয়োজনীয় কাজ বাদ যাচ্ছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। চোখকে বিরতি দিতে চাইলে প্রতি ২০ মিনিটে অন্তত ২০ সেকেন্ড প্রায় ২০ ফুট দূরের কিছুর দিকে তাকানোর ২০–২০–২০ নিয়ম চেষ্টা করতে পারেন। American Academy of Ophthalmology-এর পরামর্শ

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে যা করতে পারেন

১. আগে ব্যবহার দেখুন। ফোনের Screen Time বা Digital Wellbeing বিভাগে কোন অ্যাপে কতটা সময় যাচ্ছে, তা কয়েক দিন লক্ষ্য করুন। এতে কোন অভ্যাসটি বদলানো দরকার, তা বোঝা সহজ হবে।

২. একটি অ্যাপ দিয়ে শুরু করুন। একসঙ্গে সবকিছু বন্ধ করার বদলে সবচেয়ে বেশি সময় নেওয়া একটি অ্যাপের জন্য বাস্তবসম্মত দৈনিক সীমা ঠিক করুন।

৩. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। জরুরি যোগাযোগ চালু রেখে সামাজিক মাধ্যম বা বিনোদনের অ্যাপের নোটিফিকেশন কমাতে পারেন।

৪. ঘুমের আগে ফোন সরিয়ে রাখার চেষ্টা করুন। নির্দিষ্ট একটি সময়ের পর ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখুন। শুরুতে ৩০ মিনিট ফোন ছাড়া থাকার লক্ষ্যও যথেষ্ট হতে পারে।

৫. ফোন ছাড়া কী করবেন, সেটাও ঠিক করুন। হাঁটা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বা অন্য কোনো পছন্দের কাজ বেছে রাখলে শুধু ‘ফোন কম দেখব’ সিদ্ধান্তটি পালন করা সহজ হয়।

৬. সমস্যা চলতে থাকলে সহায়তা নিন। ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম, পড়াশোনা, কাজ বা সম্পর্কে নিয়মিত সমস্যা হলে এবং নিজের চেষ্টায় সামলাতে না পারলে একজন যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

শেষ কথা

‘দিনে কত ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম স্বাভাবিক’—প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর এক কথার উত্তর নেই। শিশুদের জন্য বয়সভিত্তিক নির্দেশিকা আছে; বড়দের জন্য বেশি জরুরি হলো ব্যবহারের উদ্দেশ্য, নিজের নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব দেখা। ফোন আমাদের কাজে লাগলে সেটি জীবনযাত্রার অংশ। ব্যবহারটি প্রয়োজনীয় কাজ ও বিশ্রামে নিয়মিত বাধা দিলে অভ্যাস বদলানোর সময় এসেছে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: দিনে দুই ঘণ্টার বেশি ফোন দেখলেই কি ক্ষতি?

উত্তর: না। প্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য দুই ঘণ্টাকে স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা বলা যায় না। কী কাজে ফোন ব্যবহার করছেন এবং তা ঘুম ও দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেলছে কি না, দেখুন।

প্রশ্ন: মোবাইল আসক্তি কি স্বীকৃত রোগ?

উত্তর: ‘স্মার্টফোন আসক্তি’ নামে আলাদা রোগনির্ণয় ICD-11-এ নেই। তবে ফোনের সমস্যাজনক ব্যবহার বাস্তব অসুবিধা তৈরি করতে পারে। গেমিং ডিসঅর্ডার আলাদা স্বীকৃত রোগনির্ণয়।

প্রশ্ন: ছোট শিশুদের কতক্ষণ স্ক্রিন দেখতে দেওয়া উচিত?

উত্তর: WHO এক বছরের কম ও এক বছর বয়সী শিশুদের বসে থেকে স্ক্রিন দেখার পরামর্শ দেয় না। দুই থেকে চার বছর বয়সীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা; কম হলে ভালো।

সূত্র