Home / Education / Post

পাহমের গল্প: জীবনের দৌড়ে “যথেষ্ট” কতটুকু?

Education Jan 21, 2026 56 views
পাহমের গল্প: জীবনের দৌড়ে “যথেষ্ট” কতটুকু?

রাশিয়ান সাহিত্যিক লিও টলস্টয়-এর অমর ছোটগল্প How Much Land Does a Man Need? কেবল একটি নৈতিক কাহিনি নয়—এটি মানব সভ্যতার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক নির্মম দর্পণ। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঠিক কখন থামবে, কোথায় থামবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টলস্টয় আমাদের সামনে হাজির করেন পাহমের গল্প।

How Much Land Does a Man Need? থেকে আধুনিক জীবনের জন্য এক কালজয়ী শিক্ষা

রাশিয়ান সাহিত্যিক লিও টলস্টয়-এর অমর ছোটগল্প How Much Land Does a Man Need? কেবল একটি নৈতিক কাহিনি নয়—এটি মানব সভ্যতার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক নির্মম দর্পণ। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঠিক কখন থামবে, কোথায় থামবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টলস্টয় আমাদের সামনে হাজির করেন পাহমের গল্প।

“Man is so constituted that the more he has, the more he wants.”

এই একটি বাক্যেই যেন পুরো গল্পের বীজ নিহিত।

পাহম: ‘আরও একটু’ চাই-এর বন্দী এক মানুষ

পাহম একজন সাধারণ কৃষক। শুরুতে তার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—নিজের জমি, নিজের ফসল, নিজের স্বাধীনতা। কিন্তু জমির মালিক হওয়ার পর তার ভেতরে জন্ম নেয় এক নতুন ক্ষুধা। সে ভাবে—

“If I had plenty of land, I shouldn’t fear the Devil himself!”

এই আত্মবিশ্বাসই ধীরে ধীরে অহংকারে রূপ নেয়। তার কাছে থাকা জমি আর “যথেষ্ট” মনে হয় না। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে—আরও জমি মানেই আরও নিরাপত্তা, আরও সুখ।


লোভের প্রস্তাব: এক দিনের দৌড়

এক দূরবর্তী অঞ্চলের লোকেরা পাহমকে এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দেয়—

“All the land you can walk round in a day shall be yours.”

শর্ত একটাই—সূর্যাস্তের আগে তাকে আবার শুরুর জায়গায় ফিরে আসতে হবে।

প্রথমে পাহম সাবধানে হাঁটে। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর তার মাথায় একটাই চিন্তা—

“I will go a little farther on; it will be a pity to lose such good land.”

এই little farther—এই “আরও একটু”—ই তার সর্বনাশ ডেকে আনে।


যখন দৌড়ই জীবনের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়

দিন গড়াতে থাকে। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ে। পাহম বুঝতে পারে সে অনেক দূরে চলে এসেছে। এখন আর হাঁটা নয়—দৌড়াতে হবে।

“His legs were heavy, his breath came short, his mouth was parched, his chest was heaving.”

শেষ মুহূর্তে, সূর্যাস্তের ঠিক আগে সে শুরুর জায়গায় পৌঁছায়। কিন্তু পৌঁছেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে—চিরতরে।

গল্পের শেষ বাক্যটি সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম নির্মম সত্য—

“Six feet from his head to his heels was all he needed.”


আধুনিক জীবনে পাহমের ছায়া

পাহম কি কেবল এক রুশ কৃষক?
নাকি সে আমরা নিজেরাই?

আজকের পেশাগত জীবনে আমরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো দৌড়ে অংশ নিচ্ছি—

  • আরও বড় designation

  • আরও বেশি salary

  • আরও একটুখানি recognition

  • আরও কিছু degree, certificate, title

  • অন্যদের চোখে সফল হওয়ার চাপ

আমরা বলি—আরও একটু হলেই থামব।
কিন্তু সেই আরও একটু কখনোই আসে না।

“The more he had, the more he wanted.”

— টলস্টয় যেন আমাদেরই গল্প লিখে গেছেন


‘যথেষ্ট’ কোথায়?

এই গল্প আমাদের এক কঠিন কিন্তু জরুরি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—

  • আমার জন্য যথেষ্ট মানে কী?

  • আমি কি যা করছি, তা সত্যিই আমার জীবনের মান উন্নত করছে?

  • নাকি আমি কেবল সমাজ-নির্ধারিত সাফল্যের পেছনে ছুটছি?

পেশাগত উন্নতি খারাপ নয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু যখন সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভারসাম্যহীন হয়ে যায়—তখনই পাহমের গল্প বাস্তব হয়ে ওঠে।


টলস্টয়ের শিক্ষা: ধীরে চলার সাহস

টলস্টয় আমাদের থামতে বলেন না—তিনি সচেতনভাবে চলতে বলেন।

One cannot live without work, but one must also know when to stop.

সত্যিকার সমৃদ্ধি কেবল সম্পদে নয়—

  • মানসিক শান্তিতে

  • সুস্থতায়

  • সম্পর্কের গভীরতায়

  • এবং জীবনের মুহূর্তগুলো উপভোগ করার সক্ষমতায়


দৌড় থাকবে, সীমারেখা আপনাকেই আঁকতে হবে

জীবন একটি দৌড় হতে পারে।
কিন্তু সেই দৌড়ের শেষ রেখাটা কোথায়, সেটি জানা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পাহমের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজন খুবই সামান্য।
আর সেই সত্য ভুলে গেলে, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো আমরা দৌড়ের মাঝেই ফেলে আসি।

আজই নিজেকে প্রশ্ন করুন—
আমার জীবনে “যথেষ্ট” আসলে কতটুকু?

গল্প সম্পর্কে কিছু তথ্য:

  • লেখক: লিও টলস্টয়

  • প্রথম প্রকাশ: ১৮৮৬ (ইংরেজি অনুবাদ: ১৮৮৭)

  • মূল শিরোনাম: Mnogo li cheloveku zemli nuzhno?

  • প্রেক্ষাপট: ১৯ শতকের শেষভাগের গ্রামীণ রাশিয়া

  • ধরণ: দৃষ্টান্তমূলক গল্প / ছোটগল্প, বাস্তববাদ

Reviews

Average: 5.0/5 (1 ratings)

Anonymous

1 month ago

পাহোমের গল্প মানুষের লোভের পরিণতি খুব বাস্তবভাবে তুলে ধরে। অল্পে সন্তুষ্ট না হলে কীভাবে সর্বনাশ ডেকে আসে, টলস্টয় তা সহজ ভাষায় গভীরভাবে দেখিয়েছেন। গল্পটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

Your review will appear after admin approval.

Related Articles

More from this category.

Education

ফাল্গুন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বসন্ত, ঐতিহ্য ও জাতিস্মৃতির বর্ণিল মাস

বাংলা পঞ্জিকার একাদশ মাস ফাল্গুন—বাংলাদেশের ঋতুচক্রে বসন্তের প্রথম বার্তা। শীতের কুয়াশা ও নিস...

Feb 15, 2026

Education

সবাই সমান, তবে কেউ কেউ বেশি সমান: সমতার আড়ালে বৈষম্যের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ

এই একটি বাক্য কেবল বিশ শতকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরের—বিশেষ করে আমাদের পেশাগত ও সামাজিক কাঠামোর এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি। জর্জ অরওয়েল যখন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এ এই লাইনটি লিখেছিলেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর বিপ্লবের বিচ্যুতি দেখানো।

Jan 28, 2026

Education

দিল্লির সম্রাটদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল যারা: বাংলার বারো ভূঁইয়া: মধ্যযুগীয় প্রতিরোধ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক শাসনের বীরত্বগাথা

বাংলার ইতিহাস মানেই কেবল পরাধীনতার দীর্ঘশ্বাস নয়; বরং এটি শৌর্য, বীরত্ব, কৌশল ও প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল মহাকাব্য। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন দিল্লির মসনদে বসা মুঘল সম্রাটেরা একের পর এক রাজ্য জয় করে উপমহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত, তখন বাংলার নদী-নালা ও জলাভূমি ঘেরা ভাটি অঞ্চলে একদল অকুতোভয় স্থানীয় শাসক গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধ। ইতিহাসে তারাই পরিচিত “বারো ভূঁইয়া” নামে।

Jan 18, 2026

Education

বাংলাদেশের আঞ্চলিক গান: মাটি, মানুষ ও জীবনের এক অনন্ত স্বরলিপি

বাংলাদেশের আঞ্চলিক গান শুধু সংগীত নয়—এটি আমাদের নদী, মাঠ, শ্রম, প্রেম, বিরহ এবং আত্মার ভাষা। এই গানগুলো কোনো রাজদরবার বা অভিজাত সংগীতসভা থেকে জন্ম নেয়নি; বরং জন্ম নিয়েছে গ্রামবাংলার উঠোনে, নদীর মাঝখানে, ধানের ক্ষেতে কিংবা গরুর গাড়ির ধুলোমাখা পথে। এই গান আমাদের ইতিহাসের এক অলিখিত দলিল—যেখানে রাজাদের বীরত্বগাথা কম, সাধারণ মানুষের জীবনকথাই মুখ্য।

Jan 14, 2026

Education

বনলতা সেন: প্রেমের কবিতা না কি বাঙালি সভ্যতার হাজার বছরের যাত্রার রূপক?

বাংলা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে এমন কিছু সৃষ্টি আছে, যেগুলো প্রথম পাঠে খুব সহজ, প্রায় নিরীহ মনে হয়। মনে হয়, এ যেন কেবল হৃদয়ের কথা—ভালোবাসা, ক্লান্তি আর আশ্রয়ের এক চেনা গল্প। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে, দ্বিতীয়বার পড়লে, কিংবা জীবনের কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় কবিতাটির চরণে ফিরে গেলে দেখা যায়, তা ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে গভীরতর অর্থের অজস্র দরজা। জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন” ঠিক তেমনই একটি কবিতা।

Jan 12, 2026