Home / Education / Post

সবাই সমান, তবে কেউ কেউ বেশি সমান: সমতার আড়ালে বৈষম্যের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ

Education Jan 28, 2026 48 views
সবাই সমান, তবে কেউ কেউ বেশি সমান: সমতার আড়ালে বৈষম্যের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ

এই একটি বাক্য কেবল বিশ শতকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরের—বিশেষ করে আমাদের পেশাগত ও সামাজিক কাঠামোর এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি। জর্জ অরওয়েল যখন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এ এই লাইনটি লিখেছিলেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর বিপ্লবের বিচ্যুতি দেখানো।

“All animals are equal, but some animals are more equal than others.”
— জর্জ অরওয়েল, অ্যানিমেল ফার্ম

এই একটি বাক্য কেবল বিশ শতকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরের—বিশেষ করে আমাদের পেশাগত ও সামাজিক কাঠামোর এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি। জর্জ অরওয়েল যখন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এ এই লাইনটি লিখেছিলেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর বিপ্লবের বিচ্যুতি দেখানো। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করি, দেখবো এই দর্শন আমাদের কর্মজীবন, অফিস সংস্কৃতি, এবং আধুনিক যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে।

১. সমতার প্রতিশ্রুতি থেকে বৈষম্যের বৈধতা

যেকোনো নতুন উদ্যোগ বা সংগঠনের শুরুতে একটি আদর্শিক প্রতিশ্রুতি থাকে— “এখানে সবাই সমান”। অ্যানিমেল ফার্মের পশুরা যখন মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে বিদ্রোহ করেছিল, তাদের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা যখন নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে পুঞ্জীভূত হয়, তখন সেই নিয়মের ব্যাখ্যা বদলে যায়।

আজকের যুগেও অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, সমতার কথা বলা হলেও সুকৌশলে ‘যুক্তি’ আর ‘কার্যকারিতা’র দোহাই দিয়ে বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া হয়। ঠিক এখানেই অরওয়েলের উক্তিটি এক চরম সত্য হয়ে ধরা দেয়—সমতা আছে, কিন্তু তা সবার জন্য এক নয়।

২. কর্মক্ষেত্রে অদৃশ্য হায়ারার্কি

আধুনিক কর্মক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই শুনি— “Open Culture”, “Flat Hierarchy” কিংবা “We are a family”। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

  • নীতিমালায় সমতা, প্রয়োগে ভিন্নতা: একই পদমর্যাদার দুজন কর্মীর মধ্যে একজন যখন নিয়ম ভাঙেন, তখন তা হয় ‘মানবিক ভুল’, কিন্তু অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি ‘অপেশাদার আচরণ’।

  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৈষম্য: প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে যখনই গুরুত্বপূর্ণ কোনো মোড় আসে, দেখা যায় ‘সমতার’ বুলি ছাপিয়ে বিশেষ কিছু মানুষের প্রভাবই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেমের অংশ।

৩. পাওয়ার ডায়নামিক্স: পদবী বনাম প্রভাব

অরওয়েল দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা থাকলে নিয়ম বদলানো যায়। আজকের কর্মজগতেও ঠিক তাই। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি উচ্চতর পদে না থেকেও শুধুমাত্র ‘ক্ষমতার সান্নিধ্য’ (Proximity to power) বা নেটওয়ার্কের কারণে অন্যদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী। অফিসের অলিখিত নীতিমালায় তখন নিঃশব্দে চালু হয়ে যায়—সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কেউ কেউ অপরিহার্য।

৪. মেরিটোক্রেসি: একটি সুন্দর মিথ?

যোগ্যতন্ত্র বা Meritocracy আজকের করপোরেট দুনিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দ। কিন্তু একই দক্ষতা আর পরিশ্রম থাকা সত্ত্বেও কেন সবাই সমান স্বীকৃতি পায় না? অরওয়েলের উক্তিটি এখানে নতুন রূপ নেয়: “সব কর্মীর মূল্যায়নই নিরপেক্ষভাবে হয়, কিন্তু কারও কারও মূল্যায়ন একটু বেশিই নিরপেক্ষভাবে হয়।” অর্থাৎ, সুযোগের সমতা এখানে কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে মেধার চেয়েও ক্ষেত্রবিশেষে চাটুকারিতা বা বিশেষ আনুকূল্যই প্রাধান্য পায়।

৫. ডিজিটাল যুগ ও নতুন বৈষম্য

ফ্রিল্যান্সিং বা গিগ-ইকোনমিকে বলা হয় স্বাধীনতার জগত। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের অলগরিদম কি সবার জন্য সমান? সেখানেও ‘হাই-রেটেড’ আর ‘নতুনদের’ মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল থাকে। যেখানে একজন দরকষাকষির সুযোগ পায়, অন্যজন থাকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। সমতা এখানেও মরীচিকা।

৬. কেন এই ব্যবস্থা টিকে থাকে?

অরওয়েল তাঁর লেখায় তিনটি প্রধান কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা আজও যে কোনো কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান:

  • ভাষার কারসাজি: নিয়মগুলোকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা যাতে বৈষম্যকেও যৌক্তিক মনে হয়।

  • অনিশ্চয়তা: কর্ম হারানোর বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করা।

  • স্বীকৃতি: বিশেষ গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দিয়ে বাকিদের মাঝে বিভাজন তৈরি করা।

৭. উত্তরণের পথ ও পেশাগত বুদ্ধিমত্তা

এই নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া মানে পরাজয় নয়, বরং সচেতন হওয়া। একজন পেশাজীবী হিসেবে টিকে থাকতে হলে এবং এগিয়ে যেতে হলে কিছু কৌশল প্রয়োজন:

  • বাস্তবতাকে চিনে নেওয়া: সমতা সব জায়গায় কাজ করবে না—এটি মেনে নিয়ে নিজের কৌশল ঠিক করা।

  • নিজের প্রভাব তৈরি করা: কেবল পদমর্যাদার ওপর নির্ভর না করে নিজের দক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা (Credibility) দিয়ে প্রভাব তৈরি করা।

  • স্বচ্ছতা ও ডকুমেন্টেশন: পেশাগত জীবনে অলিখিত বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নিজের কাজের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রাখা অত্যন্ত জরুরি।


জর্জ অরওয়েল মূলত ক্ষমতা নিয়ে লিখেছিলেন। রাষ্ট্র হোক বা অফিস—ক্ষমতা সব জায়গায় একইভাবে কাজ করে। মানুষ বদলায়, কাঠামো বদলায়, কিন্তু বৈষম্যের ব্যাকরণ অনেক সময় একই থেকে যায়। “All animals are equal, but some animals are more equal than others”—এই বাক্যটি যদি আমরা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে রাখি, তবে আমরা জীবনের বড় একটি শিক্ষা হারাব। পেশাগত জীবনে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা হলো এই বাস্তবতাকে চিনে নিয়ে নিজের নৈতিকতা ও মেধা দিয়ে মাথা উঁচু করে টিকে থাকা।

রেফারেন্স:
১. Orwell, George. (1945). Animal Farm. Secker and Warburg.
২. Young, Michael. (1958). The Rise of the Meritocracy. Penguin Books.
৩. Pfeffer, Jeffrey. (1992). Managing with Power: Politics and Influence in Organizations. Harvard Business School Press.
৪. French, J. R., & Raven, B. (1959). The Bases of Social Power. University of Michigan.

Reviews

Average: 0.0/5 (0 ratings)

No reviews yet. Be the first one!

Your review will appear after admin approval.

Related Articles

More from this category.

Education

ফাল্গুন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বসন্ত, ঐতিহ্য ও জাতিস্মৃতির বর্ণিল মাস

বাংলা পঞ্জিকার একাদশ মাস ফাল্গুন—বাংলাদেশের ঋতুচক্রে বসন্তের প্রথম বার্তা। শীতের কুয়াশা ও নিস...

Feb 15, 2026

Education

পাহমের গল্প: জীবনের দৌড়ে “যথেষ্ট” কতটুকু?

রাশিয়ান সাহিত্যিক লিও টলস্টয়-এর অমর ছোটগল্প How Much Land Does a Man Need? কেবল একটি নৈতিক কাহিনি নয়—এটি মানব সভ্যতার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক নির্মম দর্পণ। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঠিক কখন থামবে, কোথায় থামবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টলস্টয় আমাদের সামনে হাজির করেন পাহমের গল্প।

Jan 21, 2026

Education

দিল্লির সম্রাটদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল যারা: বাংলার বারো ভূঁইয়া: মধ্যযুগীয় প্রতিরোধ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক শাসনের বীরত্বগাথা

বাংলার ইতিহাস মানেই কেবল পরাধীনতার দীর্ঘশ্বাস নয়; বরং এটি শৌর্য, বীরত্ব, কৌশল ও প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল মহাকাব্য। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন দিল্লির মসনদে বসা মুঘল সম্রাটেরা একের পর এক রাজ্য জয় করে উপমহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত, তখন বাংলার নদী-নালা ও জলাভূমি ঘেরা ভাটি অঞ্চলে একদল অকুতোভয় স্থানীয় শাসক গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধ। ইতিহাসে তারাই পরিচিত “বারো ভূঁইয়া” নামে।

Jan 18, 2026

Education

বাংলাদেশের আঞ্চলিক গান: মাটি, মানুষ ও জীবনের এক অনন্ত স্বরলিপি

বাংলাদেশের আঞ্চলিক গান শুধু সংগীত নয়—এটি আমাদের নদী, মাঠ, শ্রম, প্রেম, বিরহ এবং আত্মার ভাষা। এই গানগুলো কোনো রাজদরবার বা অভিজাত সংগীতসভা থেকে জন্ম নেয়নি; বরং জন্ম নিয়েছে গ্রামবাংলার উঠোনে, নদীর মাঝখানে, ধানের ক্ষেতে কিংবা গরুর গাড়ির ধুলোমাখা পথে। এই গান আমাদের ইতিহাসের এক অলিখিত দলিল—যেখানে রাজাদের বীরত্বগাথা কম, সাধারণ মানুষের জীবনকথাই মুখ্য।

Jan 14, 2026

Education

বনলতা সেন: প্রেমের কবিতা না কি বাঙালি সভ্যতার হাজার বছরের যাত্রার রূপক?

বাংলা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে এমন কিছু সৃষ্টি আছে, যেগুলো প্রথম পাঠে খুব সহজ, প্রায় নিরীহ মনে হয়। মনে হয়, এ যেন কেবল হৃদয়ের কথা—ভালোবাসা, ক্লান্তি আর আশ্রয়ের এক চেনা গল্প। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে, দ্বিতীয়বার পড়লে, কিংবা জীবনের কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় কবিতাটির চরণে ফিরে গেলে দেখা যায়, তা ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে গভীরতর অর্থের অজস্র দরজা। জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন” ঠিক তেমনই একটি কবিতা।

Jan 12, 2026