Home / Education / Post

দিল্লির সম্রাটদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল যারা: বাংলার বারো ভূঁইয়া: মধ্যযুগীয় প্রতিরোধ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক শাসনের বীরত্বগাথা

Education Jan 18, 2026 63 views
দিল্লির সম্রাটদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল যারা: বাংলার বারো ভূঁইয়া: মধ্যযুগীয় প্রতিরোধ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক শাসনের বীরত্বগাথা

বাংলার ইতিহাস মানেই কেবল পরাধীনতার দীর্ঘশ্বাস নয়; বরং এটি শৌর্য, বীরত্ব, কৌশল ও প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল মহাকাব্য। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন দিল্লির মসনদে বসা মুঘল সম্রাটেরা একের পর এক রাজ্য জয় করে উপমহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত, তখন বাংলার নদী-নালা ও জলাভূমি ঘেরা ভাটি অঞ্চলে একদল অকুতোভয় স্থানীয় শাসক গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধ। ইতিহাসে তারাই পরিচিত “বারো ভূঁইয়া” নামে।

বাংলার ইতিহাস মানেই কেবল পরাধীনতার দীর্ঘশ্বাস নয়; বরং এটি শৌর্য, বীরত্ব, কৌশল প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল মহাকাব্য। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন দিল্লির মসনদে বসা মুঘল সম্রাটেরা একের পর এক রাজ্য জয় করে উপমহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত, তখন বাংলার নদী-নালা জলাভূমি ঘেরা ভাটি অঞ্চলে একদল অকুতোভয় স্থানীয় শাসক গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধ। ইতিহাসে তারাই পরিচিতবারো ভূঁইয়ানামে।

তাঁরা কেউ কোনো একক রাজ্যের রাজা ছিলেন না, আবার নিছক জমিদারও ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন যোদ্ধা, প্রশাসক, কূটনীতিক এবং সর্বোপরি নিজেদের ভূমির স্বাধীনতার রক্ষক। শিক্ষা গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাস মধ্যযুগীয় বাংলার আঞ্চলিক রাজনীতি, সামরিক কৌশল এবং ভূ-প্রকৃতির ভূমিকা বোঝার এক অনন্য দলিল।


এক
নজরে বারো ভূঁইয়া (Quick Facts)

প্রধান নেতা: ঈসা খাঁ
প্রধান কেন্দ্র: সোনারগাঁও
অঞ্চল: ভাটি বাংলা (বর্তমান ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট অঞ্চল)
প্রধান শক্তি: নৌবাহিনী গেরিলা যুদ্ধকৌশল
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ: রাজা মানসিংহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ (১৫৯৭)
শেষ প্রতিরোধ: ১৬১১ সালে মুসা খাঁর আত্মসমর্পণ
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা দীর্ঘদিন বিলম্বিত করা

সোনারগাঁওয়ের পানাম নগর—বারো ভূঁইয়াদের স্মৃতিবিজড়িত এক প্রাচীন জনপদ।

. ‘বারো ভূঁইয়াশব্দতত্ত্ব ঐতিহাসিক স্বরূপ

ভূঁইয়াশব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃতভূমিবাভৌমিকশব্দ থেকে, যার অর্থ ভূমির অধিকারী বা ভূমিপতি। মধ্যযুগীয় বাংলায় ভূঁইয়ারা ছিলেন

  • বৃহৎ ভূস্বামী
  • আঞ্চলিক শাসক
  • নিজস্ব সেনাবাহিনীর অধিকারী
  • কার্যত স্বাধীন বা অর্ধ-স্বাধীন প্রশাসক

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগেতারা কি সংখ্যায় সত্যিই মাত্র ১২ জন ছিলেন?

ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, ‘বারোশব্দটি এখানে সংখ্যাবাচক নয়, বরং গুণবাচক। এটিঅনেক’, ‘প্রভাবশালীবাএকটি শক্তিশালী জোটবোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন সমসাময়িক দলিল ঐতিহাসিক গ্রন্থে ভূঁইয়াদের সংখ্যা ১২-এর বেশি পাওয়া যায়। আবুল ফজল তাঁর আকবরনামা-তে এদের উল্লেখ করেছেনভাটির শাসকহিসেবে।


. রাজনৈতিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কেন বারো ভূঁইয়ার উত্থান?

বারো ভূঁইয়াদের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল একাধিক রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাভাবিক ফল।

. সুলতানি আমলের পতন (১৫৩৮)

১৫৩৮ সালে বাংলার স্বাধীন ইলিয়াস শাহী সুলতানি শাসনের পতনের পর বাংলায় রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। একদিকে আফগান শাসকদের দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে দিল্লি থেকে ক্রমাগত মুঘল আগ্রাসনএই অস্থিরতার মধ্যে স্থানীয় ভূঁইয়ারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।

. মুঘল আগ্রাসনের চাপ

সম্রাট আকবর বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিলে স্থানীয় হিন্দু মুসলিম শাসকরা বুঝতে পারেনএই আগ্রাসন প্রতিহত না করলে তাদের সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হবে। ফলে তারা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ভুলে জোটবদ্ধ হন।

. ভাটি অঞ্চলের ভূগোল: প্রাকৃতিক দুর্গ

ভাটি বাংলা ছিল নদীমাতৃক নিম্নভূমিঅসংখ্য নদী, খাল, বিল জলাভূমিতে ভরা।
এই ভূপ্রকৃতি

  • মুঘল অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য ছিল মরণফাঁদ
  • কামান ভারী অস্ত্র পরিবহনে সৃষ্টি করত সমস্যা
  • নৌযুদ্ধে দক্ষ বাঙালি যোদ্ধাদের জন্য ছিল বড় সুবিধা

এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই বারো ভূঁইয়াদের দীর্ঘদিন টিকে থাকার মূল শক্তি।


. প্রধান বারো ভূঁইয়া তাঁদের শাসিত অঞ্চল

. ঈসা খাঁ (সোনারগাঁও)

বারো ভূঁইয়াদের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন ঈসা খাঁ। তাঁর উপাধি ছিলমসনদ--আলা সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে তিনি মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। রাজা মানসিংহের মতো অভিজ্ঞ মুঘল সেনানায়ককেও তিনি পরাজিত করেছিলেন। ঈসা খাঁ ছিলেন একাধারে দক্ষ যোদ্ধা কূটনীতিক।

. প্রতাপাদিত্য (যশোর-খুলনা)

দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার এই শাসক বিশাল নৌবহর শক্তিশালী প্রশাসনের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর রাজসভায় সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা হতো। মুঘলদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল জটিলপ্রথমে প্রতিরোধ, পরে সংঘর্ষ শেষ পর্যন্ত পরাজয়।

. কেদার রায় চাঁদ রায় (বিক্রমপুর)

বিক্রমপুর অঞ্চলের এই শাসকরা মুঘলদের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য দুর্গ শক্ত নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। কেদার রায় নৌযুদ্ধে বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন।

. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ভূঁইয়া

  • লক্ষ্মণমাণিক্য (ভুলুয়া/নোয়াখালী)
  • মুকুন্দরাম রায় (ভূষণা/ফরিদপুর)
  • কংস নারায়ণ (নাটোর)
  • রামচন্দ্র রায় (রাজশাহী অঞ্চল)


. সামরিক কাঠামো যুদ্ধকৌশল

বারো ভূঁইয়াদের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল তাদের সামরিক উদ্ভাবন।

. নৌবাহিনী নৌশক্তি

তারা ব্যবহার করতেন দ্রুতগামী রণতরী বাকোষ সরু নদীপথে মুঘলদের ভারী জাহাজ ঢুকতে না পারলেও ভূঁইয়াদের নৌকা চতুর্দিক থেকে আক্রমণ চালাতে পারত।

. গেরিলা যুদ্ধনীতি

সম্মুখ সমরের পরিবর্তে তারা হিট অ্যান্ড রান কৌশল অবলম্বন করতেনঅতর্কিত আক্রমণ করে দ্রুত সরে যেতেন।

. মৃত্তিকা দুর্গ

নরম মাটি ব্যবহার করে নির্মিত উঁচু দুর্গগুলো কামানের গোলাও অনেক সময় সহ্য করতে পারত।

মুঘলদের বিরুদ্ধে নৌযুদ্ধে ব্যবহৃত দ্রুতগামী কোষ নৌকার একটি ঐতিহাসিক প্রতিরূপ।

. মুঘল-ভূঁইয়া সংঘাত চূড়ান্ত পরিণতি

. আকবরের আমল

সম্রাট আকবর বহু চেষ্টা করেও বারো ভূঁইয়াদের পুরোপুরি দমন করতে পারেননি। ১৫৯৭ সালের যুদ্ধে মুঘল বাহিনী গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে।

. জাহাঙ্গীর ইসলাম খান চিশতি

সম্রাট জাহাঙ্গীর বুঝতে পারেন যে কেবল সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়। সুবাদার ইসলাম খান চিশতি পরিকল্পিত অভিযানে নামেন।

১৬১০ সালে তিনি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন (জাহাঙ্গীরনগর) একে একে ভূঁইয়াদের পরাজিত করা হয়। ১৬১১ সালে ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ আত্মসমর্পণ করলে বারো ভূঁইয়াদের যুগের অবসান ঘটে।


. ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

বারো ভূঁইয়াদের শাসনামলে

  • হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিল উল্লেখযোগ্য
  • স্থানীয় সংস্কৃতি নৌ-প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে
  • কেন্দ্রীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনা গড়ে ওঠে

তাঁদের এই সংগ্রামকে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে দেখা যায়।


. শিক্ষা গবেষণায় প্রাসঙ্গিকতা

বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাস আমাদের শেখায়

  • কেন্দ্র বনাম প্রান্তিক শক্তির দ্বন্দ্ব
  • ভূপ্রকৃতি কীভাবে যুদ্ধকৌশল নির্ধারণ করে
  • মধ্যযুগীয় বাংলার নৌ-ইতিহাসের গুরুত্ব

এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


উপসংহার

বারো ভূঁইয়ারা হয়তো শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারেননি, কিন্তু তাঁদের দুই দশকের প্রতিরোধ বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। তাঁরা ছিলেন বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঙালির আত্মপরিচয় স্বাধিকার রক্ষার প্রথম দিকপাল। তাঁদের বীরত্বগাথা কেবল অতীত নয়এটি আজও সাহস আত্মমর্যাদার অনুপ্রেরণা।


নির্বাচিত তথ্যসূত্র গ্রন্থপঞ্জি

  • আবুল ফজলআকবরনামা
  • মির্জা নাথানবাহারিস্তান--গায়বি
  • . রমেশচন্দ্র মজুমদারবাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ)
  • Richard M. Eaton – The Rise of Islam and the Bengal Frontier
  • বাংলাপিডিয়াএশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ

Reviews

Average: 0.0/5 (0 ratings)

No reviews yet. Be the first one!

Your review will appear after admin approval.

Related Articles

More from this category.

Education

ফাল্গুন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বসন্ত, ঐতিহ্য ও জাতিস্মৃতির বর্ণিল মাস

বাংলা পঞ্জিকার একাদশ মাস ফাল্গুন—বাংলাদেশের ঋতুচক্রে বসন্তের প্রথম বার্তা। শীতের কুয়াশা ও নিস...

Feb 15, 2026

Education

সবাই সমান, তবে কেউ কেউ বেশি সমান: সমতার আড়ালে বৈষম্যের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ

এই একটি বাক্য কেবল বিশ শতকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরের—বিশেষ করে আমাদের পেশাগত ও সামাজিক কাঠামোর এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি। জর্জ অরওয়েল যখন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এ এই লাইনটি লিখেছিলেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর বিপ্লবের বিচ্যুতি দেখানো।

Jan 28, 2026

Education

পাহমের গল্প: জীবনের দৌড়ে “যথেষ্ট” কতটুকু?

রাশিয়ান সাহিত্যিক লিও টলস্টয়-এর অমর ছোটগল্প How Much Land Does a Man Need? কেবল একটি নৈতিক কাহিনি নয়—এটি মানব সভ্যতার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক নির্মম দর্পণ। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঠিক কখন থামবে, কোথায় থামবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টলস্টয় আমাদের সামনে হাজির করেন পাহমের গল্প।

Jan 21, 2026

Education

বাংলাদেশের আঞ্চলিক গান: মাটি, মানুষ ও জীবনের এক অনন্ত স্বরলিপি

বাংলাদেশের আঞ্চলিক গান শুধু সংগীত নয়—এটি আমাদের নদী, মাঠ, শ্রম, প্রেম, বিরহ এবং আত্মার ভাষা। এই গানগুলো কোনো রাজদরবার বা অভিজাত সংগীতসভা থেকে জন্ম নেয়নি; বরং জন্ম নিয়েছে গ্রামবাংলার উঠোনে, নদীর মাঝখানে, ধানের ক্ষেতে কিংবা গরুর গাড়ির ধুলোমাখা পথে। এই গান আমাদের ইতিহাসের এক অলিখিত দলিল—যেখানে রাজাদের বীরত্বগাথা কম, সাধারণ মানুষের জীবনকথাই মুখ্য।

Jan 14, 2026

Education

বনলতা সেন: প্রেমের কবিতা না কি বাঙালি সভ্যতার হাজার বছরের যাত্রার রূপক?

বাংলা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে এমন কিছু সৃষ্টি আছে, যেগুলো প্রথম পাঠে খুব সহজ, প্রায় নিরীহ মনে হয়। মনে হয়, এ যেন কেবল হৃদয়ের কথা—ভালোবাসা, ক্লান্তি আর আশ্রয়ের এক চেনা গল্প। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে, দ্বিতীয়বার পড়লে, কিংবা জীবনের কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় কবিতাটির চরণে ফিরে গেলে দেখা যায়, তা ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে গভীরতর অর্থের অজস্র দরজা। জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন” ঠিক তেমনই একটি কবিতা।

Jan 12, 2026